সেদিন বৃহস্পতিবার ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বিকেল ৪টা বেজে ৩১ মিনিট।

0
296

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে জনসম্মুখে পরাজিত কোন সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছে। এইদিনে পরাভূত নীতিহীন, হার্মাদ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেছিল।

সেদিন বিকেলে শীতের সন্ধ্যে নেমে এসেছে প্রায়, কুয়াশাচ্ছন্ন ম্লান আলোয় ৯ মাস স্থায়ী রাহুর গ্রাস থেকে বেড়িয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করেছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মানুষ, আমাদের ভালোবাসা জানবেন…

১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯,১০…………… সংখ্যাগুলো পেরুতে লাগলো, সময়ের স্রোতে আমরা কেউ তারুণ্যে, কেউ যৌবনে, কেউ প্রৌড়ত্ত্বে কেউবা বার্ধক্যে পৌঁছেছি।

কিন্তু ১৯৭১ সালে গৌরব ও বেদনার স্বাধীনতার যুদ্ধে, যে অসীম সাহসী, নির্ভীক, তুলনাহীন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা, বেঁচে থাকা ভবিষ্যতের এই আমাদের জন্য আত্মদান করে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন তাঁদের বয়স কিন্তু আর বাড়লোনা।

তাঁরা থেমে রইলেন সোনালী যৌবনে, চির তারুন্যের নির্ভীক উদাহরন হয়ে। আজ বিজয় দিবসে বিনায়বনত হয়ে, হৃদয়ের নিখাঁদ ভালবাসায়, শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি আপনাদের।

আনত শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতা সহ মুক্তিযুদ্ধের সকল সেক্টর কম্যান্ডার, সাব সেক্টর কম্যান্ডার সহ সকল শহীদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের, অবনত শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের।

স্মরণ করছি তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধেয় শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সে সকল সদস্য’কে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে আত্মত্যাগ করেছেন, আহত হয়েছেন। স্মরণ করছি কোলকাতা, আসাম, মেঘালয় অন্যান্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের, যারা একাত্তরে কোটি বাঙালিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধায় সকল বিদেশী বন্ধুদের। যারা শর্তহীন ভালবাসায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অদেখা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রতি।

আপনারা চিরঞ্জীব, চির সবুজ, আমাদের আদর্শে পরিণত হওয়া মানুষ। আপনারা কিংবদন্তী, আপনাদের কাছে আমরা আমৃত্যু ঋণী, যে ঋণ শোধ করবার কোন সুযোগ আপনারা আমাদের দিয়ে যাননি। পরম করুনাময়, আপনাদের সকলকে সেই তুলনাহীন ভালবাসার চাদরে আচ্ছাদিত করেছেন জানি, যে ভালবাসায় আপনারা নিজ জীবন উৎসর্গ করেছেন।

যুদ্ধের বীভৎসতা দেখা, ও প্রত্যক্ষ করা মানুষদের ভিড়ে, ‘গেরিলা ১৯৭১’ পরিবারের অনেকেই আছেন৷ আজকের এই দিনে একদিকে স্বজন হারাবার সুতীব্র যন্ত্রণা, শোক, নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের হাহাকার, চোদ্দ পুরুষের ভিটে ছাড়া হওয়া মানুষের চোখের জল, অন্যদিকে ভাসছিলো জয়ধ্বনি। এত মৃত্যুর পর হু হু শীতের বাতাসে অগণিত মানুষ হয়তো নিশ্চল হয়েই দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন জীবনের অপরূপ সম্ভাবনার কথা।

বাংলাদেশের অমানুষদের কথা আমরা আজ ভাববো না৷ ভাববো বাংলাদেশের মানুষদের কথা, যাদের আমরা সবসময় পাশে পাই, যাদের জন্য আমরা বিজয়ী, বিজয়ী জাতিগুলোর একটি…

আমাদের পূর্বসূরিরা জানতেন শত্রু’কে। নিজ অস্তিত্বের শত্রুকে চিনতে ভুল করেননি তাঁরা। অভূতপূর্ব একতায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও দেশীয় অমানুষ সহচর’দের সকল বর্বরতা’র বিরুদ্ধে বাঙলা’র মানুষ এক ছিলেন।

সময় বদলেছে, শত্রু বদলায়নি। শত্রু আরও বেশী শক্তিশালী, নতুন রঙে, মুখোশে, মোড়কে সক্রিয়। আর,আমরা নিজেদের বিভেদের দেয়ালে, আত্মকোন্দলে, আত্মঅহমিকার কুৎসিত ‘আরক’ পান করে সুযোগ করে দিয়েছি এবং দিচ্ছি আমাদের জন্মশত্রু’দের, আমাদের অস্তিত্বের শত্রু’দের।

‘বাংলা’ নামের দেশটি দাঁড়িয়ে আছে ত্রিশ লক্ষাধিক শহীদের রক্তস্নাত অবস্থায়। ১৬ ডিসেম্বর হচ্ছে সেই দিন, যার জন্য সাড়ে সাত কোটি মানুষ অপেক্ষমান ছিল এক সর্বসংহারি যুদ্ধের মাঝেও।

একাত্তরের ঘাতক অমানুষরা যেন পুনর্বার শহীদের রক্তরাঙা পতাকা শোভিত গাড়িতে না চড়ে। ঘাতক ও ঘাতকদের উত্তরসূরিরা যেন বাংলাদেশে ঠাঁই না পায়।

একইসাথে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে ‘বহুবর্না গিরগিটি’ ও তাদের ‘সুমিষ্ট মিথ্যাচার’ থেকেও। বেড়িয়ে আসতে হবে ‘জী হুজুর’ ও ‘সহমত’ এর নীল বিষ থেকেও। ‘অমুক বা তমুকের কথাই বেদবাক্য,বাকিরা মিথ্যুক’ এমন আত্মবিধ্বংসী চর্চা থেকে বাঁচতে এবং সত্য অনুসন্ধানের তাড়না থেকেই প্রশ্ন করুন,যাচাই করুন। নিজের চেষ্টায় জেনে নিন ইতিহাস।

আমাদের ভালোবাসার প্রতি অশ্রুকণার বিনিময়ে বাংলাদেশ উদ্ভাসিত হোক পৃথিবীর বুকে মর্যাদা নিয়ে, আজকের দিনে এটাই প্রার্থনা…

জয় বাঙলা…… জয় বাঙলা…… জয় বাঙলা……

“তোমার আমার স্বাধীনতা
রক্তের মত লাল স্বাধীনতা,
তোমার আমার স্বাধীনতা
আকাশের মত নীল স্বাধীনতা,
জেনো সংগ্রাম আনে স্বাধীনতা
জেনো ভাবনা আনে স্বাধীনতা,
৪৭ নয় স্বাধীনতা, ৪৭ নয় স্বাধীনতা
৪৭ আনেনি, দেয়নি স্বাধীনতা।।

কৈশোর থেকে শুধু শুনে গেছি তোমার নাম
ইতিহাসের পাতায় পড়ে গেছি তোমার নাম
তুমি নাম থেকে গেছ স্বাধীনতা
তুমি নাম থেকে গেছ স্বাধীনতা,
তোমার নাম নিয়ে করে খেলো কিছু লোক
তুমি নেই বলে খেলো না অনেক বেশি লোক,
খেতে পাওয়ার নাম স্বাধীনতা
কাজ পাওয়ার অধিকার স্বাধীনতা
পড়তে পারার নাম স্বাধীনতা
ভাবতে শেখার নাম স্বাধীনতা,
জেনো সংগ্রাম আনে স্বাধীনতা
জেনো ভাবনা আনে স্বাধীনতা,
৪৭ নয় স্বাধীনতা, ৪৭ নয় স্বাধীনতা
৪৭ আনেনি, দেয়নি স্বাধীনতা।

তার দুটি চোখ যেন খাঁচায় বন্দী হরিণী
মুক্তির দাবী দাওয়া জানাতে সে আজো পারে নি
তার চোখে জ্বলে ওঠো স্বাধীনতা
তার দেহে ভাষা দাও স্বাধীনতা,
যেই অশনি হানবে তার দৃষ্টি
তুমি শুকনো মাটিতে এনো বৃষ্টি,
তার ঠোঁটে কেঁপে ওঠো স্বাধীনতা
তার নখে ধার হও স্বাধীনতা,
তাকে নিয়ে প্রতিরোধ স্বাধীনতা
জেনো সংগ্রাম আনে স্বাধীনতা
জেনো ভাবনা আনে স্বাধীনতা
৪৭ নয় স্বাধীনতা
৪৭ আনে নি,দেয় নি স্বাধীনতা।”

কথা ও সুরঃ কবির সুমন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে