শীতকালীন রোগবালাই ও তা ওপশমের উপায়।

0
159

এই মাঘে প্রকৃতির আচরণ বোঝা মুশকিল। কখনো দেখা যাচ্ছে বসন্তের মতো একটা গরম-গরম ভাব, আবার কখনো হি হি শীত। এই তো, মাত্র কদিন আগে গত শনিবার ফেনী জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। রাজধানী ঢাকায়ও সেদিন ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিন চারেক যেতে না যেতেই মাঘ মাস যেন চিরচেনা আচরণ করছে। বইতে শুরু করেছে শৈত্যপ্রবাহ। তবে মাঘের শীতের দাপট চললেও রাজধানী ঢাকায় তেমন একটা নেই।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামোগত কারণ, বিপুলসংখ্যক যান চলাচল ও সুউচ্চ ভবনের কারণে ঢাকার বুকে এখন আর শীত জেঁকে বসতে পারছে না।

আর এই শীতকালে যে সকল অসুখ হয়ে থাকে তার মধ্যে ঠাণ্ডাজনিত অসুখ-ই প্রধান। সব’চে প্রথমে দেখা দেয় টনসিলাইটিস, এডিনাইটিস, মাম্পস, বাতের ব্যথা, হজমজনিত গণ্ডগোলসহ পেটফুলে থাকা এবং শীত বেশী হলে দেখা দেয় ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, মাস্‌ল ক্রাম্প, আর্টিকেরিয়া ইত্যাদি। এসব ওষুধের প্রতিষেধক এসময় ঋতুকালীন যেসকল ফলমূল ও সবজী জন্মে তার মাঝে থাকে। যেমন কমলা খেলে শীতের কারণে সৃষ্ট রোগগুলি মানুষদের সহজে অসুস্থ্য করতে পারে না। তেমনি শীতকালে খিরা খেলে ঠাণ্ডা কম লাগে। শীতে নানা ধরনের শাকসবজি পাওয়া যায়, সবই উপকারী কিন্তু শীতে টমেটোর গুরুত্বই অন্যরকম। টমেটো খেলে হার্টের অসুখের ঝুকি অনেক কমে যায়, এটি রক্তকেও বিশুদ্ধ করে। তবে মনে রাখবেন সবগুলি ফলমূল ও শাকসবজি যেন প্রাকৃতিক হয় অর্থাৎ এগুলি যেন হাইব্রিড না হয় এবং এগুলির চাষে যেন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা না হয়। যা বলছিলাম সাধারণত শীতে আমাদের দেশে কি কি রোগ হতে দেখা যায়। যে রোগগুলি হয় তার খুব সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে, এসব অসুখে কি কি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ চলতে পারে তার নামগুলি দিচ্ছি।

Credit: cfl.ca

• মাম্পসঃ ঠাণ্ডা বাতাস লাগার ফলে যখন কারো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে তখন প্যারামিক্সোভাইরাস দ্বারা লালা গ্রন্থি(প্যারোটিড গ্ল্যান্ড) আক্রান্ত হয়। তখন নীচের চোয়াল সহ গাল ফুলে উঠে। রোগী বড় করে মুখ খুলে হা করতে পারে না। সে সাথে জ্বরও থাকে। গালের ফোলা সপ্তাহ খানেক হতে দশদিন পর্যন্ত থাকে। সাধারণত একদিকেই লালা গ্রন্থি আক্রান্ত হয়। মাম্পস হতে কখনো কখনো অন্য অঙ্গও আক্রান্ত হয়। সাধারণত তিন বছরের পর হতে টিনঅ্যাজ পর্যন্ত দেখা যায়। বড়দের খুব কম হতে দেখা যায়।
ঔষধঃ বেলাডোনা, রাস টক্স, মার্ক সল, মার্ক বিন আয়োড, মার্ক বিন রুব্রাম, পালসাটিলা… ইত্যাদি।

• টনসিলাইটিসঃ মুখের ভিতরে গলার দুপাশে লিম্ফয়েড টিস্যুর যে গ্ল্যান্ড থাকে তাকে টনসিল বলা হয়। এটিও সাধারণত বাচ্চাদের বেশী হয়ে থাকে। শীতকালে ঠাণ্ডা লাগার ফলে এ গ্লান্ডগুলি ফুলে যায়, জ্বর হয়, শরীরে ব্যথাও থাকে। রোগী ঢোক গিলতে পারেনা। গ্লান্ডগুলি ফুলার কারণে আকারে বড় হয় এবং অনেক সময় এগুলি পেকে যায়। টনসিল কারো কারো ক্ষেত্রে শীতকাল ছাড়াও বছরের অন্যান্য সময়ও দেখা যায়। অনেকেই সার্জারির মাধ্যমে এগুলি কেটে ফেলেন। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়না কারণ প্রত্যেক শীতেই তখন রোগী ঠাণ্ডা জনিত রোগে বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে ভুগে। কারণ টনসিল রোগজীবাণু প্রতিরোধ করে থাকে।
ঔষধঃ বেলাডোনা, ব্যারাইটা কার্ব, হেপার সালফ, মার্ক সল, মার্ক বিন আয়োড, মার্ক বিন রুব্রাম, ফাইটোলাক্কা,থুজা, টিউবারকুলিনাম … ইত্যাদি।
• এডিনাইটিসঃ মুখের ভিতরে তালুর পেছনে এ গ্রন্থির অবস্থান। টনসিলের মতই এ গ্রন্থিও রোগজীবাণুকে দেহে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এডিনাইটিস হওয়ার কারণে শিশু ঘুমের সময় নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারেনা তাই মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়। ঘুমের সময় নাক দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ হয়। যেহেতু হোমিওপ্যাথিতে রোগের নাম ধরে চিকিৎসা হয়না, লক্ষণের উপর নির্ভর করে ওষুধ দেয়া হয়, তাই বহু ওষুধ যা টনসিলাইটিসে দেয়া হয়, সে ওষুধগুলি ব্যবহিত হয়।
ঔষধঃ বেলাডোনা, ব্যারাইটা কার্ব, কেল্কেরিয়া কার্ব, কেল্কেরিয়া জুডেটাম, কেল্কেরিয়া ফস, থুজা, টিউবারকুলিনাম … ইত্যাদি।

• চিকুনগুন্‌য়া জ্বরঃ শীতকালে এ জ্বর হতে দেখা যায়। চিকুনগুন্‌য়া ভাইরাস বহনকারী মশা যখন মানুষকে কামড়ায়, তখন ম্যালেরিয়ার মতই এরোগ ও মানবদেহে ছড়ায়। এতে হঠাৎ করে ১০৪-১০৫ ডিগ্রী জ্বর হয়, যা পাচ-সাতদিন পর্যন্ত থাকে। মাথাব্যথা সহ সমস্ত শরীরে জোড়ায় জোড়ায় এত তীব্র ব্যথা যে রোগীর নড়াচড়া অসহ্য মনে হয়। কখনো চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। অনেকের মাঝে ত্বকে মশার কামড়ের মত অনেক লাল লাল ফোঁটা ফোঁটা দাগ পড়ে। দশদিনের মধ্যে যদিও রোগ সেরে যায় কিন্তু সার্বিক দুর্বলতা আরো সপ্তাহ খানেক বা দশদিন পর্যন্ত থাকে।
ঔষধঃ আর্সেনিক এলবাম, বেলাডোনা, ব্রাইয়োনিয়া,ইউপেটোরিয়াম পার্‌ফ, রাস টক্স, সালফার … ইত্যাদি।

• বাতব্যথাঃ শীতকালে সাধারণত গাউট ও আরথ্রাইটিস উভয় ধরনের বাতের বৃদ্ধি দেখা যায়। এ রোগটি বয়স্কদের হয়ে থাকে।
ঔষধঃ আরনিকা, বেঞ্জোইক এসিড, ব্রাইয়োনিয়া, কেল্কেরিয়া কার্ব, কষ্টিকাম, কলচিকাম, রাস টক্স … ইত্যাদি।
• হজমজনিত গণ্ডগোলসহ পেটফুলাঃ এটিও মূলত মধ্য বয়স্কদের মাঝে দেখা দেয়। শীতকালে তাদের অন্যদের তুলনায়ে শীত বেশী লাগে, এবং তাদের খাবারও অনেক দেরীতে হজম হয়। ক্ষুধা লাগেই না। আবার কখনো ক্ষুধা লাগলে পরে, সামান্য একটু খাওয়ার পরই পেট ভরা মনে হয়। বেশীর ভাগ সময়ে পেটে গ্যাস জমে পেট ফুলে শক্ত হয়ে যায়। পেটে অসহনীয় ব্যথা যা বুকে এবং পিঠে ছড়িয়ে পড়ে। রোগীর প্রায় মরার মত শোচনীয় অবস্থা হয়।
ঔষধঃ একোনাইট, আর্সেনিক, ব্রাইয়োনিয়া, কার্বো ভেজ, চায়না, লাইকোপোডিয়াম … ইত্যাদি।

• হাইভ্‌স্‌ বা আর্টিকেরিয়াঃ শীতকালে আজকাল প্রায় তরুণ-তরুণীদের মাঝে এবং যুবক-যুবতীদের মাঝে এটা দেখা যায়। এতে ত্বকের বিভিন্ন স্থানে লাল লাল চাকা চাকা হয়ে ফুলে উঠে। তবে শীতে হজমের গণ্ডগোলের কারণে, বিশেষ করে লিভারের দুর্বলতার কারণেও এমনটা হয়ে থাকে তাই এটাকে অনেকে শীতপিত্ত রোগও বলে থাকেন।
ঔষধঃ এপিস, ডাল্‌কামারা, রাস টক্স, আর্টিকা ইউরেন্স … ইত্যাদি।

• মাস্‌ল ক্রাম্পঃ সাধারণত শীতে মধ্যবয়স রোগে ভুগা দুর্বল লোকদের মাঝেই এটি দেখা দেয়। দিন বা রাত যেকোন সময় দেখা দেয়। পেশীর খিঁচুনির সাথে তীব্র ব্যথা হয়।
ঔষধঃ কেল্কেরিয়া কার্ব, কল্‌চিকাম, কষ্টিকাম … ইত্যাদি।

• ব্রংকাইটিসঃ ঠাণ্ডায়ে যখন শ্বাসনালী সহ ফুসফুসে বাতাস যাতায়াতকারী সরু নালীর প্রদাহ হয় তখন এ রোগ হয়। এটি সাধারণত শিশুদের বেশী হয়ে থাকে। এ রোগেও জ্বর, কাশ, শ্বাসকষ্ট থাকে।
ঔষধঃ অ্যান্টিম টার্ট, আর্সেনিক, ব্রাইয়োনিয়া, ড্রসেরা, ফেরাম ফস, হেপার সালফ, ইপিকাক, নেট্রাম সালফ, স্পঞ্জিয়া, টিউবারকুলিনাম … ইত্যাদি।

• নিউমোনিয়াঃ এতে শ্বাসনালীর পরিবর্তে ফুসফুসের প্রদাহ হয়। এখানেও জ্বর, কাশ ও তীব্র শ্বাসকষ্ট থাকে।
ঔষধঃ অ্যান্টিম টার্ট, আর্সেনিক, ব্রাইয়োনিয়া, নেট্রাম সালফ, ফসফরাস, টিউবারকুলিনাম … ইত্যাদি।

• অ্যাজমাঃ বুকে সাঁ সাঁ শব্দ সহ নিঃশ্বাসে কষ্ট, রোগী নিঃশ্বাসে বাতাস নেয়ার জন্য তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করে, হাঁপাতে থাকে। বিছানায় শুতে পারেনা, কিছু খেতে পারেনা। শ্বাসকষ্ট সাধারণত রাতেই বেশী থাকে, রাত বাড়ার সাথে সাথে শ্বাসকষ্ট বাড়ে, সকালের দিকে রোগী কিছুটা স্বস্তি বোধ করে। আজকাল ঘরে ঘরে ছোট শিশুদের মাঝে এবং বয়স্কদের মাঝেও এ রোগ দেখা দিচ্ছে। ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া এসব রোগের উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে এ রোগ দেখা দেয়। এছাড়া কনভেন্সনাল চিকিৎসায় অ্যালার্জির জন্য অতিরিক্ত সিনথেটিক ড্রাগ নেয়ার সাইড ইফেক্ট হিসেবে এবং আরো কিছু ড্রাগের সাইড ইফেক্ট হিসেবে এ যন্ত্রণা দায়ক অসুখের সৃষ্টি হয়।
ঔষধঃ অ্যান্টিম টার্ট, আর্সেনিক, এরেলিয়া, ব্রাইয়োনিয়া, ব্লাটা ওরিয়েন্টালিস, ক্যালি কার্ব, নেট্রাম সালফ, পালসাটিলা, টিউবারকুলিনাম … ইত্যাদি।

এছাড়া এবারের শীতে অনেক জায়গায় ডায়রিয়াও যথেষ্ট মাত্রায় দেখা গিয়েছে।
শারীরিক সুস্থতা ও হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে কিছু ধারনা দেয়ার জন্য এই লেখা। অনুরোধ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ খাবেন না।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে